Agaminews
Dr. Neem Hakim

নব্বইয়ের সাড়া জাগানো নায়িকা মৃত্যুর আগে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করতেন ঔষধ।


দৈনিক বিজনেস ফাইল প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫, ৫:০৫ অপরাহ্ন /
নব্বইয়ের সাড়া জাগানো নায়িকা মৃত্যুর আগে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করতেন ঔষধ।

বিজনেস ফাইল ডেস্ক 

একাকিত্ব ও মানবেতর কষ্টে মারা গেলেন নব্বই দশকে রুপালি পর্দা কাঁপানো চিত্রনায়িকা শাহিনা শিকদার বনশ্রী। মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন মাদারীপুরের শিবচরে। নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ পরিণতিতে কাউকে পাশে পাননি এ অভিনেত্রী।

 

শিবচরের মাদবরের চর ইউনিয়নের মেয়ে বনশ্রী। ১৯৭৪ সালের ২৩ আগস্ট এই এলাকার শিকদারকান্দি গ্রামে জন্ম তার। বাবা মজিবুর রহমান মজনু শিকদার ও মা সবুরজান রিনার দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে বনশ্রী বড়। সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি।

Banashri.1‘সোহরাব রুস্তম’ সিনেমার পোস্টার ও বার্ধক্যে চিত্রনায়িকা বনশ্রী। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৪ সালে মমতাজ আলীর পরিচালনায়  ‘সোহরাব রুস্তম’ সিনেমা দিয়ে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে বনশ্রীর। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে ছবিটি ব্যবসা সফল হয়। পরিচিতি পান বনশ্রী। এরপর আরো গোটাদশেক সিনেমায় অভিনয় করেন। নায়ক মান্না, আমিন খান, রুবেলের বিপরীতেও নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন বনশ্রী। তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে ‘নেশা’, মহাভূমিকম্প, ‘প্রেম বিসর্জন’, ‘ভাগ্যের পরিহাস’ উল্লেখযোগ্য।

Banashri.3একমাত্র ছেলের সঙ্গে বনশ্রী। ছবি: সংগৃহীত

রুপালি পর্দার মতো বনশ্রীর জীবনও হয়ে ওঠে আলো ঝলমল। একের পর এক সাফল্য, তারকাখ্যাতি। তবে খুব বেশিদিন সেই সুখ সয়নি বনশ্রীর কপালে। ভাগ্যদোষে ছিটকে পড়েন তিনি সিনেমা থেকে। অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের কারণে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান এই নায়িকা। এরপর থেকেই বিষাদময় জীবন শুরু হয় অভিনেত্রীর। একটা সময় পথে পথে ঘুরে দিন কেটেছে তার। থেকেছেন বস্তিতেও। শাহবাগে একসময় ফুলের ব্যবসায়ও করেছেন। বাসে বাসে হকারিও করতে হয়েছে তিনবেলা খাবার জুটাতে। বনশ্রীর দুই সন্তান ছিল। তার মধ্যে মেয়েটি ছিনতাই হয়ে গেছে। মেয়ে যখন সেভেনে পড়ে তখন এক অডিও কোম্পানির মালিক তার মেয়েকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছিলেন বনশ্রী। থানা-পুলিশ করেও মেয়েকে আর ফেরত পাননি।

 

 

 

একসময় শহুরে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই শেষে তিনি ফিরে যান নিজ এলাকা মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়। নানা জায়গায় ঘুরে অবশেষে এ চিত্রনায়িকার ঠাঁই হয় আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ছোট্ট ঘরে। ছেলে মেহেদী হাসান রোমিওকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন সেখানেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া ২০ লাখ টাকার সুদ হিসেবে মাসে মাসে যা পান, তা দিয়েই চলত তার সংসার। কিন্তু সেটাও কপালে সয়নি।

জীবনের শেষ সময়ে ভুগছিলেন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টে। প্রায় চোখের দৃষ্টি হারিয়েছিলেন তিনি। অভাব-অনটনে জর্জরিত জীবনের শেষ দিনগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন গ্রামে ভিক্ষা করে ওষুধ সংগ্রহ করতেন বনশ্রী। মৃত্যুর কিছুদিন আগে দেশের বিত্তবান ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের কাছে সহযোগিতা চাইলেও তেমন কোনো সাড়া পাননি।

Banashri.4

চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন গ্রামে ভিক্ষা করে ওষুধ সংগ্রহ করতেন বনশ্রী। ছবি: সংগৃহীত

শিবচর থানার পাঁচ্চর এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ছোট্ট ঘরই ছিল তার শেষ আশ্রয়। রান্না করতে না পারায় প্রায়ই প্রতিবেশীদের কাছে খাবার চাইতেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় থাকা একমাত্র ছেলে মায়ের খোঁজখবর নিতেন না। অবশেষে জীবন থেকে মুক্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন একসময়ের এই জনপ্রিয় নায়িকা।

একসময় লাখো দর্শকের প্রিয় এই অভিনেত্রীর জীবনের শেষ অধ্যায় কেটেছে একাকিত্ব ও মানবেতর কষ্টে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রের এমন পরিণতি শুধু সিনেমাপ্রেমীদের নয়, সমগ্র সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্যই এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।