ঢাকা   ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ । ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির গৌরবের ইতিহাস

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৮, ২০২৪
  • 231 শেয়ার

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ঘুমন্ত বাঙালি জাতির উপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করে তখন ধানমণ্ডির ৩২ নং বাড়িতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেন। ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বলে বিভিন্ন নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতা ঘোষণার খবর প্রকাশ করে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন। এছাড়াও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খবরটি প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালকানারী স্বাধীনবাংলা সরকারও এই ঘোষণাটি প্রচার করে বিভিন্ন দেশে।
ইংরেজিতে লেখা সেই ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘This may be my last message, from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved’.
এর বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় এমন: ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’ (সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।
বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। এই বার্তা প্রেরণের পরে বঙ্গবন্ধু আরেকটি লিখিত বার্তা সর্বত্র প্রেরণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু প্রেরিত দ্বিতীয় বার্তায় বলা হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ, দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোনো আপস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুণ। জয় বাংলা’।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঐদিন রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং এর তিন দিন পর তাঁকে বন্দী অবস্থায় পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
২৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে। ২৬ শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন।
সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে এক বছরের মধ্যে দেশের সংবিধান প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, সেনাবাহিনী পুলিশ বিডিআর পুনর্গঠন,শত শত পুল কালভার্ট যেগুলি পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংস করেছিল সবগুলো পুনঃনির্মাণ করে দেশকে যখন দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের গুপ্তচর খ্যাত জিয়াউর রহমান ও আওয়ামী লীগেরই ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাবাদী কুলাঙ্গার খন্দকার মোস্তাক শুরু করেন ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ৭৫ শালের ১৫ ই আগস্ট পথভ্রষ্ট কিছু উশৃংখল সেনা সদস্যের সহযোগিতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের প্রগতির চাকা পুরোপুরি বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ধুলিস্যাৎ করে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন আমাদের সোনার বাংলাকে। ৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পরাজিত শক্তির দোসর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধ রাজাকার আল বদর আলসামস এর নেতৃত্ব দেওয়া জামায়াতে ইসলামকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে রাজনীতির সুযোগ করে দেওয়া হয়। শুরু করে পরিকল্পিতভাবে জাতির পিতার পরিবার ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে গুজব ও অপপ্রচার। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু হয় হত্যা ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে আস্কারা দেওয়া হয়, ইতিহাস বিকৃতি করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বানানো হয় স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানপন্থী চক্রকে।
জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে যেই অন্ধকারের দিকে বাংলাদেশকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে অন্ধকার থেকে দেশকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ সার্ভে এন্ড ভ্যালুয়েশন কম্পানিস ফার্মস এন্ড ইন্ডিভিজুয়াল কনসার্ন এসোসিয়েশন ।
www.bsvcfica.org

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২০