
বিজনেস ফাইল প্রতিবেদক
বানিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২ (২০২২ সালের ৯ নম্বর আইন) জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এই আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার গত ২০ মে, ২০২৫ বিধিমালা প্রণয়ন করে। এই বিধিমালা অনুযায়ী এফবিসিসিআই এবং এর অধিভুক্ত চেম্বার এবং এসোসিয়েশনগুলি পরিচালিত হবে।
আগে এফবিসিসিআই এবং চেম্বার-এসোসিয়েশন গুলি নিজস্ব সংঘবিধি অনুযায়ী পরিচালিত হতো। সংঘবিধিতে প্রতিটি চেম্বার এবং এসোসিয়েশনের নিজস্ব চাহিদা, প্রয়োজন, এবং এর অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের স্বার্থ সংরক্ষন করা হতো।
এই সংঘবিধির মধ্যে যা কিছু লিপিবদ্ধ থাকতো, তার পরিবর্তন করতে হলে- সাধারণ সদস্যদের ইজিএম আহবান করে দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে তা করতে হতো। কিন্তু বিগত সরকারের আমল থেকে স্বৈরাচারী কায়দায় ‘বাণিজ্য সংগঠন বিধি’তে তা ঢুকিয়ে সংঘবিধি পরিবর্তনের সিষ্টেম চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ সদস্যদের মতামতের কোন তোয়াক্কা করা হতো না। এর ফলে এফবিসিসিআই সহ বাণিজ্য সংগঠনগুলি সরকারের আজ্ঞাবহ সংগঠনে পরিণত হয়।
এফবিসিসিআই সংশ্লিষ্ট একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, গত ৫ আগষ্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়। সারাদেশে সংস্কার- বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবী ওঠে। এফবিসিসিআই এর প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্টরা উপর থেকে নাজিল হয়ে আসতো। ভেষ্টেড ইন্টারেষ্ট গ্রুপ আর বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণই যেন এফবিসিসিআইয়ের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়। অধিভুক্ত ক্ষুদ্র মাঝারী চেম্বার আর এসোসিয়েশনগুলি হতো উপেক্ষিত। এর মধ্যে আবার বিভিন্ন অজুহাতে ক্ষুদ্র মাঝারী খাতের এসোসিয়েশনগুলোকে কিভাবে বাদ দেয়া যায়, সেইটাই ছিল তাদের একমাত্র গবেষণার বিষয়। ইতোমধ্যে অনেক এসোসিয়েশনের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অনেক সংগঠনকে সুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, যেখান থেকে এফবিসিসিআইয়ের সদস্য হতে পারবে না।
৫ আগষ্টের পর আমরা অন্য সকলের মতো এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন এবং পরিচালনা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবী তুলি। এই লক্ষ্যে আপনাদেরকে সাথে নিয়ে আমরা অনেকগুলি সভা করে আপনাদের মতামত গ্রহণ করি।
আরেকজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, আমরা এফবিসিসিআইতে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের দাবী তুলি। নমিনেটেড ডাইরেক্টর প্রথা উঠিয়ে দেবার কথা বলি। ক্ষুদ্র মাঝারী চেম্বার আর এসোসিয়েশনগুলি যাতে বৈষম্যের শিকার না হয়, তাদের স্বার্থ যাতে সংরক্ষিত হয়, তার জন্যে দাবী করি।কিন্তু একমাত্র প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি নির্বাচনের পদ্ধতি চালু করা ছাড়া আর সব দাবী এই বিধিমালায় কেবল অগ্রাহ্যই করা হয়নি, বরং বেশকিছু গণবিরোধি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হয়।এর কিছু বর্ননা আপনাদের কাছে উপস্থাপন করছি।
১। আমরা দাবী করেছিলাম পরবর্তী সময়কাল থেকে এফবিসিসিআইতে পরিচালকদের দুইটার্ম থাকার পরে একটার্ম বিরতি দিতে হবে। কিন্তু এবিষয়ে অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে। কবে থেকে এইটা কার্যকর হবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।যে কোন আইনের বৈশিষ্ঠ হলো -“আইন ভুতাপেক্ষ কার্যকর হয় না”। আমরা বারবার বলেছি,চেম্বার এবং এসোসিয়েশন গুলিতে যেন কোন ভাবেই এই সিষ্টেম প্রয়োগ না করা হয়।চেম্বার এবং এসোসিয়েশনগুলির সংঘবিধিতে যেমনটা আছে সেইটা যেন বলবৎ রাখা হয়।কারন,এর ফলে ছোট চেম্বার আর এসোসিয়েশনের মধ্যে নেতৃত্বের শুন্যতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু সব চেম্বার আর এসোসিয়েশনের জন্য এই দুই বছর মেয়াদি দুই টার্ম এর পরে এক টার্ম বিরতির কথা বলা হয়েছে। এমনকি বিদ্যমান পরিচালনা পরিষদের কেউ নির্বাহী সদস্য পর্যন্ত হতে পারবে না।
২। চেম্বার আর এসোসিয়েশনের সদস্যভুক্তি আর বার্ষিক চাঁদার হার ব্যাপক ভাবে বাড়ানো হয়েছে। যেখানে আগে সদস্যভুক্তি ফি ছিল তিন হাজার আর বার্ষিক চাঁদা ছিল ১৫০০টাকা এখন সেখানে করা হয়েছে সাধারন সদস্যদের জন্য ১৫,০০০/- টাকা। বার্ষিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,০০০/- টাকা। এসোসিয়েট সদস্যদের জন্য এই হার ১০,০০০/- আর ৩,০০০/- টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র মাঝারী ব্যবসাগুলো চেম্বার আর এসোসিয়েশনের সদস্য হতে চাইবে না। এমনিতে ভ্যাট, ট্যাক্স, ঋণের সুদের হার নিয়ে সাধারণ শিল্প-ব্যবসায়ীরা জর্জরিত।
৩। এফবিসিসিআই তে বার্ষিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে “ক” শ্রেনীর এসোসিয়েশনের জন্য ৭৫,০০০/- টাকা, আর চেম্বারের জন্য ১,০০,০০০/-টাকা।। অথচ কিছুদিন আগে এইটা ছিল যথাক্রমে ২৫,০০০/- আর ৩০,০০০/- টাকা । মাত্র কিছু দিন আগে যা বাড়িয়ে ৩৫,০০০/- আর চেম্বারের জন্য ৪৫,০০০/- নির্ধারণ করা হয়। ছোট ছোট চেম্বার আর এসোসিয়েশনের জন্য এখন এই বর্ধিত চাঁদার হার হয়ে দাঁড়াবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা এর মতো।
৪। এফবিসিআইতে সদস্যপদের নিবন্ধন ফি দেয়া লাগতো ২,০০০/- টাকা। অল্প কিছুদিন আগে এইটা করা হয়েছিল ২৫০০/- টাকা। এখন সেইটা করা হয়েছে ২০,০০০/- টাকা।
এতো গেল, চাঁদার হিসাব। সবচেয়ে যা ভয়ংকর, তা হলো,সামান্য অজু্হাতে আপনাদের সংগঠনকে “সুপ্ত”,এমনকি “বাতিল” করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। ৫০০ এর নীচে সদস্যসংখ্যা থাকলে আপনার এসোসিয়েশন আর “ক” শ্রেনীতে থাকতে পারবে না। আপনার চেম্বার আর এসোসিয়েশনকে নামিয়ে দেয়া হবে “খ” শ্রেনীতে।এফবিসিসিআইতে আপনার চেম্বারের সদস্য সংখা কমে ৪ এবং এসোসিয়েশনে ৩ এ নামিয়ে আনা হবে। যাকে স্বৈরাচারি আচরণবললেও কম বলা হয়। তাছাড়া নমিনেটেড ডাইরেক্টর সিষ্টেমও বাতিল হয় নি।
এইসব করা সম্ভব হয়েছে, এফবিসিসিআইতে ভাতের হোটেল খুলে ঘাঁটি গেড়ে বসা কতিপয় ব্যক্তির সহায়তায়। অনির্বাচিত প্রশাসকের মাধ্যমে। এরা আবার সংবাদ সম্মেলন করে এইসব কর্মকান্ডের প্রশংসা করেছে। নির্লজ্যতার একটা সীমা থাকা উচিৎ…..!
সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত চাঁদা, বিল্ডিং ভাড়া আর অনুদানের মাধ্যমে এফবিসিসিআই এর বার্ষিক আয় একেবারে কম নয়। নতুন করে চাঁদা না বাড়িয়ে কৃচ্ছতাসাধন করলে- এই অর্থ এফবিসিসিআই এর পরিচালন ব্যয়ের জন্য যথেষ্ঠ।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, এখন সময় এসেছে এইসব অপকর্ম আর সদস্যদের স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে আপনার ন্যায্যস্বার্থ আদায়ের সংগ্রামে শরীক হওয়া।
খুব শীঘ্রই আমরা আপনাদের নিয়ে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে, ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য একত্রিত হবো।
আপনার মতামত লিখুন :