বিজনেস ফাইল ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের উত্তাপ গত রোববার কিছুটা প্রশমিত হয়। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একধরনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেছে উভয় পক্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে অভিহিত করেছেন “১২ দিনের যুদ্ধ” নামে—যা তার ভাষায়, “বছরের পর বছর ধরে চলতে পারত এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে দিতে পারত।”
যদিও ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই নিজেদের শর্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করছে, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়:
ইসরায়েল কী অর্জন করল? ইরান কি তার কৌশলগত পারমাণবিক অবকাঠামো রক্ষা করতে পারল? এবং এই যুদ্ধবিরতি কি সত্যিকার অর্থে শান্তির দ্বার উন্মোচন করবে, নাকি এটা আরেক দফা সংঘাতের বিরতিমাত্র?
সংঘাতের শুরু ও তাৎক্ষণিক পাল্টাপাল্টি হামলা:
গত শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইরানের ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ট্রাম্পের ভাষায়, এসব স্থাপনা “পুরোপুরি ধ্বংস” করা হয়েছে। জবাবে সোমবার ইরান কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি আল উদেইদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
পরিস্থিতি তখন এমন ছিল যে, মধ্যপ্রাচ্য হয়তো আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, “একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।” এর চার ঘণ্টা পর ইসরায়েল আবার হামলা চালায়। ইসরায়েল দাবি করে, ইরান থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, যা প্রতিহত করা হয়েছে। জবাবে তারা তেহরানের উপকণ্ঠে একটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করে।
ট্রাম্প তখন সাংবাদিকদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “আমি অসন্তুষ্ট যে ইসরায়েল আজ সকালে হামলা চালিয়েছে। দুটি দেশ এত দিন ধরে যুদ্ধ করে যাচ্ছে যে তারা জানেই না, এখন কী করছে।”
পরিস্থিতি কিছুটা স্থির হলে আবারও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ট্রাম্প তখন জানান, ইসরায়েল আর হামলা চালাবে না এবং ইরানের প্রতি “প্লেন ওয়েভ” অর্থাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত জানিয়ে সব বিমান ঘাঁটিতে ফিরে যাবে।
ইসরায়েলের প্রাপ্তি কী?
ইসরায়েল বহু বছর ধরেই ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি বলে দাবি করে আসছে। তবে এবারই প্রথম তারা ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালায়। “অপারেশন রাইজিং লায়ন” নামের অভিযানে নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের বিভিন্ন ফ্যাসিলিটিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।
যদিও ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তবুও বিশ্লেষকরা বলছেন—ইসরায়েল এবার প্রমাণ করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি একটি অভিযানে সম্পৃক্ত করতে পারে। অতীতে ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিলেও, সরাসরি লড়াইয়ে জড়ায়নি। এবারে সেটিই ঘটেছে।
ইরান কী রক্ষা করতে পেরেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরানের ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে। কিন্তু স্বাধীনভাবে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ জানিয়েছে, তারা এখনো সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে পারেনি এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র অজানা।
সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, “সেন্ট্রিফিউজগুলো চরম কম্পন-সংবেদনশীল। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।” আইএইএ আরও জানায়, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার অবস্থান অনিশ্চিত।
ইরান অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে, তাদের কর্মসূচি থেমে থাকবে না। পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেন, “আমরা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুত এবং উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত হবে না।”
কে ছুড়ল সেই ক্ষেপণাস্ত্র?
মঙ্গলবার সকালে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। ইরান দায় অস্বীকার করলেও এটি পরিকল্পিত, না দুর্ঘটনাজনিত—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে, ২০২১ সালে ইরানের সামরিক বাহিনী ভুল করে ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করেছিল।
শান্তি না নতুন সংঘাত?
বর্তমানে কার্যকর কেবল একটি যুদ্ধবিরতি, কোনো শান্তি চুক্তি নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুটি পথ সামনে খোলা:
১) জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানের পারমাণবিক সাইটগুলোতে নতুন পরিদর্শন ও একটি আপডেট চুক্তি
২) আবারও সংঘাত
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গত ২০ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া ক্যাল্লাসসহ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসেন, যাতে মার্কিন হামলা ঠেকানো যায়। যদিও সফল হয়নি, তবুও ইউরোপ এখনো কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাব্য পথ।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ানিস কোটৌলাস বলেন, “ইরান উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রস্তাব দিয়ে ইউরোপকে পাশে পেতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচিকে হয়তো মেনে নেওয়া হতে পারে। রাশিয়া এখন তেহরানের কাছে অবিশ্বস্ত।”
তবে ইসরায়েল কি রাজি হবে?
ইতিহাস বলছে, ইসরায়েল আগেও ইরান-চুক্তি বানচাল করতে সক্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র জেসিপিওএ থেকে সরে যাওয়ার পর আবার নতুন চুক্তির আলোচনা চলাকালে ইরানে হামলা চালানো হয়েছে—ফলে তেহরানের আপসের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
ইরানি ইতিহাসবিদ আলী আনসারি বলেন, “ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বড় নিয়ামক হবে। তবুও ইরান এখনো অনড় বলে প্রতীয়মান।”
পরিস্থিতির সংকেত আরও স্পষ্ট হয় সোমবার, যখন ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার সঙ্গে সব সহযোগিতা স্থগিত করার একটি বিল অনুমোদন করে।
ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, “ইরান যেন পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু না করে—এ বিষয়ে আমরাও কঠোর।”
এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উত্তেজনা থেমে নেই। একদিকে ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্রের ছায়া—এই দ্বন্দ্বপূর্ণ বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে পরবর্তী সংঘাত সময়ের অপেক্ষা কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।












Leave a Reply